স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জে কথিত ‘জিনের হাজিরা’ ও অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা, জমি ও ব্যাংকের স্বাক্ষরিত চেক নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, ১ হাজার ভরি স্বর্ণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে এসব অর্থ ও সম্পদ নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার সময় বায়জুর গ্রামের বিদুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে ধনু মিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্ত তাওহীদ বিন আজাদের সঙ্গে বাদীর পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
বাদীর অভিযোগ, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পারিবারিক বিরোধের কারণে তার স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি তাওহীদের সহযোগিতা চান। এ সময় তাওহীদ নিজেকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী দাবি করে ২১ দিনের মধ্যে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। একপর্যায়ে কথিত ওই ক্ষমতার প্রতি বাদীর বিশ্বাস তৈরি হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে অভিযুক্ত বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কথা বলে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন এবং একপর্যায়ে জিনের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করেন বলে অভিযোগ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাদীর বাড়িতে কথিত ‘জিনের হাজিরা’ আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন শর্তের কথা বলে অর্থ দাবি করা শুরু হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীর দাবি, কথিত জিনের নির্দেশের কথা বলে ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ২৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হলে সেই অর্থ জোগাড় করতে বাদীর মায়ের মালিকানাধীন জমি বিক্রি করা হয়। শায়েস্তাগঞ্জের পুরান বাজার এলাকার এক ক্রেতার কাছে জমি বিক্রির পর দুই দফায় ওই টাকা অভিযুক্তের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপরও অর্থের দাবি অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ করেন বাদী। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে একটি চুক্তিনামা সম্পাদন এবং ৩৫ লাখ টাকার একটি চেকসহ আরও একটি স্বাক্ষরিত ব্ল্যাংক চেক অভিযুক্তকে দেওয়া হয় বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে বাদীর মায়ের মালিকানাধীন জমি বিক্রি করে অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি কিছু জমি ‘জামানত’ হিসেবে অভিযুক্তের নামে রেজিস্ট্রি করতে বলা হয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কয়েকটি দলিলের মাধ্যমে মোট ২৮ শতক এবং পরবর্তী সময়ে আরও ৪২ শতক জমি অভিযুক্তের নামে জামানত হিসেবে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয় বলে দাবি বাদীর।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বাদীর মায়ের নামে থাকা জমির অংশও বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ১০ শতক জমি ২৮ লাখ টাকা এবং ৯ শতক জমি ২৭ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ। এছাড়া মোটরসাইকেল কেনার জন্য লঙ্গাপাড়া এলাকার ১ দশমিক ৪০ শতক জমি বিক্রি করে পাওয়া ২ লাখ ৮০ হাজার টাকাও অভিযুক্তের হাতে দেওয়া হয় বলে বাদীর দাবি।
বাদীর অভিযোগ, কথিত জিনের হাজিরার মাধ্যমে একাধিকবার অর্থ নেওয়া হলেও প্রতিশ্রুত ১ হাজার ভরি স্বর্ণ তাকে দেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির কথিত আরেকটি হাজিরায় তাকে ১০ জুনের মধ্যে ১ হাজার ভরি স্বর্ণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে আবারও কথিত জিনের হাজিরা অনুষ্ঠিত হয় বলে বাদীর দাবি। ওই সময় তার ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে ১০টি এবং তার মা সুফিয়া খাতুনের ব্যাংক হিসাবের বিপরীতে চারটি ব্ল্যাংক চেক নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এজাহারে বলা হয়, বাদীর মায়ের আগে কোনো ব্যাংক হিসাব না থাকায় ২৯ জুন হবিগঞ্জ শাখার সিটি ব্যাংকে একটি হিসাব খোলা হয়। পরে ওই হিসাবের চারটি চেকে তার মায়ের টিপসই নিয়ে অভিযুক্তের কাছে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাদীর কাছ থেকে আরও ৮৫ হাজার টাকা নগদ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাদীর দাবি, ৫ জুলাই ২০২৬ তিনি ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প নিয়ে হাফেজ মাওলানা নূরুল আমিন ও নাইমুল হাসানকে সঙ্গে করে হবিগঞ্জের নূরুল হেরা জামে মসজিদ মার্কেটে যান। সেখানে ‘নুসাইবা মিডিয়া’ নামের একটি দোকানে তার দাবি-দাওয়া উল্লেখ করে তিনটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা তৈরি করা হয়।
এজাহার অনুযায়ী, ওই অঙ্গীকারনামায় চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদ অঙ্গীকারকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। সাক্ষী হিসেবে হাফেজ মাওলানা মুহিবুর রহমান, হাফেজ মাওলানা নূরুল আমিন, নাইমুল হাসান ও আহমদুল হক স্বাক্ষর করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। দেড় মাসের মধ্যে কথিত ‘জিনের দেওয়া’ স্বর্ণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও সেখানে ছিল বলে বাদীর দাবি।
তবে পরবর্তী সময়ে ২০ আগস্ট ২০২৬ অভিযুক্তের আইনজীবীর স্বাক্ষর করা একটি লিগ্যাল নোটিশ পান বলে জানান বাদী। ওই নোটিশে ৩৫ লাখ টাকা পাওনা দাবি করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে বাদীর দাবি। সেখানে তার মা সুফিয়া খাতুনসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। বাদীর অভিযোগ, বৈঠকে অভিযুক্ত প্রথমে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করেন এবং অঙ্গীকারনামার স্ট্যাম্প ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেন। উপস্থিত ব্যক্তিরা ছেঁড়া স্ট্যাম্পগুলো উদ্ধার করেন বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
বাদী আরও অভিযোগ করেন, ওই রাতেই মসজিদ মার্কেটের সামনে অভিযুক্তের কাছে থাকা চেক ও অন্যান্য কাগজ ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হলে তিনি সব ধরনের লেনদেন অস্বীকার করেন। পাশাপাশি ওই চেক ব্যবহার করে তাকে ও তার মাকে দীর্ঘদিন কারাগারে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া সম্পদ ফেরত পেতে বাদী হবিগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অভিযোগ করেন এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
বাদীর অভিযোগ, নেওয়া অর্থ দিয়ে অভিযুক্ত হবিগঞ্জের রাজনগর কবরস্থানের পাশে একটি বাসা ও মোটরসাইকেল কেনেন। এছাড়া বাইশ সড়কের আনোয়ারপুর পয়েন্টে ‘তাওহীদ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি হার্ডওয়্যার দোকান এবং সুনামগঞ্জের দিরাই থানার টুকদিরাই এলাকায় ‘তৌহিদ সমন্বিত এগ্রো ফার্ম’ গড়ে তোলার কথাও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
বাদী জানিয়েছেন, অভিযোগের সমর্থনে ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী, অঙ্গীকারনামা, বৈঠকের ভিডিও ও কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন নথি তদন্তকারী সংস্থার কাছে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের মাধ্যমে আরও কেউ প্রতারণার শিকার হয়েছেন কি না এবং ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে বাদী আমিনুল ইসলামের আরও অভিযোগ, ‘জামানত’ হিসেবে দেওয়া জমিগুলো কৌশলে নিজের নামে সাব-রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তাওহীদ বিন আজাদ। এ বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টার অভিযোগও করেছেন তিনি।
বাদীর দাবি, কোটি টাকার স্বর্ণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনায় শায়েস্তাগঞ্জের কয়েকজন জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ প্রশাসনের সদস্যদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। অর্থের ভাগ দেওয়ার আশ্বাসে অভিযুক্তকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতারণার শিকার হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন আমিনুল ইসলাম। বরং অভিযুক্তের পক্ষ নিয়ে কথা বলা হয়েছে বলেও দাবি তার। এতে তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত চৌধুরী তাওহীদ বিন আজাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।