
চুনারুঘাট প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে উলামা পরিষদ চুনারুঘাট আয়োজিত সীরাত মাহফিল, জেলা-ব্যাপী হিফজুল কুরআন ও সীরাত কুইজ প্রতিযোগিতা–২০২৬।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জামিয়া শামসূল উলূম কওমী মাদরাসা, চুনারুঘাট প্রাঙ্গণে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক উলামায়ে কেরাম, হাফেজ, ক্বারী, ইমাম-মুয়াজ্জিন, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানটি মাওলানা মাহফুজ আল মানসুর, মাওলানা শাহ শরীফুদ্দীন সুফিয়ান ও মাওলানা উবায়দুর রহমান সিরাজীর যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, শামসূল উলূম কওমী মাদরাসা চুনারুঘাট এর সদরে মুহতামিম- মাওলানা জহুর আলী সাহেব, মাওলানা উলফত উল্লাহ সাহেব, মাওলানা ফজলুল হক সাহেব, মাওলানা শাহ আলাউদ্দিন সাহেব (শায়খে করিমপুরী), পীরে কামেল শায়েখ আব্দুল মজিদ সাহেব ও মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব।
হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা:
অনুষ্ঠানের পূর্বপর্বে সকাল ৯টা থেকে চুনারুঘাট মডেল মসজিদ সংলগ্ন তাহফিজুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা অ্যান্ড কিন্ডারগার্টেনে অনুষ্ঠিত হয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা। এতে চুনারুঘাটসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও এলাকার মাদরাসার কোমলমতি হাফেজ শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে। তাদের মধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ পাঠে মুখরিত হয়ে ওঠে মাদরাসা প্রাঙ্গণ।
প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত ১৫ জন হলেন-
১ম-মো. তাসিব উদ্দীন, প্রতিষ্ঠান: তাহফিজুল কুরআন মডেল মাদরাসা, বামৈ, লাখাই। ২য়-মো. আফসর আহমদ ফয়েজ, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া মাহমুদিয়া মাদরাসা, বানিয়াচং। ৩য়-মো. আহমদুল হাসান, প্রতিষ্ঠান: মারকাজুল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ মডেল মাদরাসা, হবিগঞ্জ। ৪র্থ-মো. তাফাজ্জুল হোসেন তুহিন, প্রতিষ্ঠান: নূরুল ফুরকান হাফিজিয়া মাদরাসা, শাইলগাছ। ৫ম -মুহা. তারিফ হামজা, প্রতিষ্ঠান: মারকাজুল উলূম আল ইসলামিয়া মাদরাসা, সুলতান মুহাম্মদপুর, হবিগঞ্জ। ৬ষ্ঠ-মো. মুজাক্কির আহমদ, প্রতিষ্ঠান: বায়তুল কুরআন নূরানী হাফিজি মাদরাসা, নির্জাপুর। ৭ম-মো. সাফওয়ান আহমদ, প্রতিষ্ঠান: বায়তুল কুরআন নূরানী হাফিজি মাদরাসা, মির্জাপুর। ৮ম-মো. জয়নাল আবেদীন, প্রতিষ্ঠান: পাইকুরা নূরুন্নেছা নূরানী হাফিজি মাদরাসা, চুনারুঘাট। ৯ম-ইসমাইল হোসেন রাতুল
প্রতিষ্ঠান: কালিশিরী মদীনাতুল উলূম মাদরাসা। ১০ম -মো. আজহারুল হক শিবির, প্রতিষ্ঠান: বায়তুল কুরআন নূরানী হাফিজি মাদরাসা, হবিগঞ্জ। ১১তম-মো. সারফিন আহমদ, প্রতিষ্ঠান: জামিউল কুরআন মডেল মাদরাসা, হবিগঞ্জ। ১২তম-মো. ইফতেখার আহমদ ফাত্তাহ, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া মাহমুদিয়া মাদরাসা, বানিয়াচং। ১৩তম-মো. শফিকুর রহমান চৌধুরী, প্রতিষ্ঠান: বানিয়াচং দারুসসুন্নাহ হোসাইনিয়া মাদরাসা। ১৪তম-মো. সামি আহমদ চৌধুরী, প্রতিষ্ঠান: জামিউল কুরআন মডেল মাদরাসা, লাখাই, হবিগঞ্জ। ১৫তম-মো. ইফাদ আহমদ, প্রতিষ্ঠান: জামিউল কুরআন মডেল মাদরাসা, লাখাই, হবিগঞ্জ।
প্রতিযোগিতা শেষে হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। পরে বিশেষ মেহমান মুফতি অলিউর রহমান বরুণী সাহেবের উপস্থিতিতে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
সীরাত কুইজ প্রতিযোগিতা:
এরপর অনুষ্ঠিত হয় সীরাত কুইজ প্রতিযোগিতা। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, সীরাত, চরিত্র, দাওয়াত ও ইসলামের ইতিহাসভিত্তিক বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের জ্ঞান যাচাই করা হয়। বিভিন্ন বয়স ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তিনটি গ্রুপে এতে অংশগ্রহণ করে।
ক-গ্রুপ: প্রবন্ধ:
১ম:মো. শফি আহমদ, প্রতিষ্ঠান: মারকাজুল ইলম, ঢাকা; রাণীগাঁও। ২য়-মো. ইহসানুল হক, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া নূরে মদীনা, শায়েস্তাগঞ্জ; চুনারুঘাট। ৩য়-রাজিয়া খানম, প্রতিষ্ঠান: মাসুদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, রাণীগাঁও।
খ-গ্রুপ: ছড়া-কবিতা:
১ম-বিনতে নূরুল হক, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া শারইয়্যাহ, ধুলিয়াখাল। ২য়-মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া মাহমুদিয়া, হামিদনগর, বাহুবল। ৩য়-কামরুল ইসলাম, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া, গোয়াছপুর।
গ-গ্রুপ: সীরাত সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর:
১ম-ফাতিহা নাজনিন তানিশা, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া কারিমিয়া কিন্ডারগার্টেন, চুনারুঘাট। ২য়-মো. নাবিল আহমদ, প্রতিষ্ঠান: জামিয়া মাহমুদিয়া, হামিদনগর, বাহুবল। ৩য়-নুসরাত জাহান ইশা, প্রতিষ্ঠান: গ্রিনফেয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শায়েস্তাগঞ্জ।
সীরাত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পাশাপাশি ১৮তম স্থান পর্যন্ত সীরাত গ্রন্থ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন মাদরাসা, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে আরও ৩০টি বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
সীরাত মাহফিল:
অনুষ্ঠানে বিশেষ মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুফতি অলিউর রহমান বরুণী সাহেব। এছাড়া বিভিন্ন পর্বে বয়ান ও নসিহত পেশ করেন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মুফতি মুশাহিদ কাসেমী সাহেব।
সীরাত মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান পেশ করেন দেশের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, তরজুমানে আহলে সুন্নাহ, শায়খুত তাফসির আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলিপুরী সাহেব। তাঁর বয়ানে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র সীরাত, সুন্নাহ ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে।
আয়োজকদের বক্তব্য:
আয়োজকরা জানান, উলামা পরিষদ চুনারুঘাট প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উপজেলার উলামায়ে কেরামের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, দ্বীনি শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার এবং সমাজে নৈতিক ও ধর্মীয় সচেতনতা সৃষ্টি করা। এরই ধারাবাহিকতায় সীরাত মাহফিল, হিফজুল কুরআন ও সীরাত কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
উলামা পরিষদ চুনারুঘাটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অল্প সময়ের প্রস্তুতির মধ্যেও পরিষদের সদস্যরা নিজেদের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে অনুষ্ঠানটি সফল করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, বাজার, হাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দাওয়াত ও প্রচারণা চালানো হয়। অনুষ্ঠানে ধর্মপ্রাণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণে আয়োজকরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে যারা অনুষ্ঠানের দাওয়াত পাননি, তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন তারা।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
অনুষ্ঠান সফল করতে সহযোগিতা করায় জামিয়া শামসূল উলূম কওমী মাদরাসার সম্মানিত উস্তাদবৃন্দ, পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আয়োজকরা। পাশাপাশি অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা, স্পনসরশিপ ও অন্যান্যভাবে সহযোগিতাকারীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তারা।
আয়োজকরা বলেন, “এটি শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়; বরং চুনারুঘাটের উলামায়ে কেরাম ও দ্বীনপ্রিয় মানুষের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সম্মিলিত দ্বীনি খেদমতের একটি প্রয়াস। ভবিষ্যতেও সকলকে সঙ্গে নিয়ে দ্বীন, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে চায় উলামা পরিষদ চুনারুঘাট।”
.
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল একদল তরুণ আলেমের হাত ধরে উলামা পরিষদ চুনারুঘাট আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। উপজেলার বয়োজ্যেষ্ঠ আলেম-উলামাদের উপদেষ্টা করে পরিষদটি শূরাভিত্তিকভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
পরিষদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো-আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকিদার প্রতি বিশ্বাস, আনুগত্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখা, কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ শিক্ষা প্রচার করা এবং সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ করা। পাশাপাশি উপজেলার আলেম-উলামা, হাফেজ, ক্বারী, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও দ্বীনি ব্যক্তিদের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার, সমাজে নৈতিক ও ধর্মীয় সচেতনতা সৃষ্টি, তরুণ প্রজন্মকে দ্বীন ও সীরাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং মানুষের দ্বীনি ও মানবিক কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করা।
পরিষদের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-মাদক, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, কুসংস্কার, অনৈতিকতা ও অন্যান্য সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ইলম, হিকমাহ ও উত্তম পন্থায় জনসচেতনতা সৃষ্টি; সীরাত মাহফিল, হিফজুল কুরআন ও সীরাত কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজন; কুরআন-হাদিসভিত্তিক শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম; দাওয়াতি কর্মসূচি; আলেম-উলামাদের মতবিনিময় সভা; দ্বীনি ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ; অসহায় ও বিপদগ্রস্ত আলেম-উলামাদের পাশে দাঁড়ানো এবং মেধাবী ও অসচ্ছল দ্বীনি শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ইত্যাদি।
এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দ্বীনি ঐক্য, নৈতিক জাগরণ, সামাজিক কল্যাণ ও মানবিক দায়িত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে উলামা পরিষদ চুনারুঘাট। সময় ও প্রয়োজনের আলোকে ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রম আরও ব্যাপক, সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আগামীতে চুনারুঘাট উপজেলার সর্বস্তরের আলেম-উলামা, হাফেজে কুরআন, ক্বারী, ইমাম-মুয়াজ্জিন, দ্বীনি শিক্ষক ও ইসলামপ্রেমী সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দ্বীন, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করে যেতে চায় উলামা পরিষদ চুনারুঘাট।